Trade Media
     

ফোর্ট কোচি


ফোর্ট কোচির ঐতিহাসিক শহরটিকে ভালভাবে দেখার সেরা উপায় হচ্ছে পায়ে হেঁটে বেড়িয়ে পড়া। ধীরেসুস্থে, লম্বা নিঃশ্বাস নিয়ে, সুতীর জামা-কাপড় গায়ে দিয়ে ও নরম জুতো পায়ে দিয়ে, আর হ্যাঁ— একটা বেতের টুপি মাথায় দিয়ে বেড়িয়ে পড়ুন। এই শহরের একটি নিজস্বতা রয়েছে, এটি ফেলে আসা যুগের অসংখ্য স্মারক ধারণ করে রয়েছে এবং আজও সেই যুগের গর্বে গর্বিত। আপনার যদি অতীতের ঘ্রান নেবার ক্ষমতা থাকে তাহলে আপনি এই শহরটির রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারবেন না।

কে.জে. মার্শাল রোড ধরে সোজা হেঁটে গিয়ে বাঁ-দিকে বাঁক নিন, আপনার সামনে এসে দাঁড়াবে ইমানুয়েল দুর্গ। এই দুর্গ-প্রাসাদটি অতীতে পর্তুগীজদের আস্তানা ছিল এবং কোচির মহারাজা সঙ্গে পর্তুগালের সম্রাটের বন্ধুত্বের প্রতীক ছিল, যাঁর নামেই এর নামকরণ। এই দুর্গ-প্রাসাদটি নির্মিত হয়েছিল 1503 সালে এবং পুনর্গঠিত হয় 1538 সালে। আরেকটু এগিয়ে গেলে আপনি ওলন্দাজদের সমাধিক্ষেত্রে এসে পৌঁছবেন। 1724 সালে উৎসর্গীকৃত এবং দক্ষিণ ভারতের গির্জা দ্বারা পরিচালিত এই সমাধিক্ষেত্রটি এখানে আসা পর্যটকদের সেই সমস্ত ইউরোপীয়দের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় যাঁরা নিজেদের ঘর-পরিবার ত্যাগ করে ঔপনিবেশক সাম্রাজ্য বিস্তারে বেরিয়ে পড়েছিলেন।

পরের দ্রষ্টব্যস্থলটি হল প্রাচীন ঠাকুর হাউস, যেটি ঔপনিবেশিক যুগের একটি কংক্রিট স্থাপত্য হিসেবে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। ভবনটি সত্যিই মাধুর্যপূর্ণ। অতীতে কুনাল বা পাহাড়ি বাংলো নামে পরিচিত এই ঠাকুর হাউস ব্রিটিশ শাসনকালে জাতীয় ব্যাঙ্কের কর্মকর্তাদের আবাসস্থল ছিল। বর্তমানে এটি বিখ্যাত চা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ঠাকুর অ্যান্ড কোম্পানির অধীনস্থ।

আরও একটু হেঁটে যান, সেখানে আপনার জন্য অপেক্ষা করে রয়েছে আরেকটি ঔপনিবেশিক স্মারক— ডেভিড হল। ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দ্বারা এটি আনুমানিক 1695 সালে নির্মিত। হলটি খ্যাত নামা ওলন্দাজ সেনাপতি হেনড্রিক অ্যাড্রিয়ান ভ্যান রীড টট ড্র্যাকেস্টনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত, যাঁর প্রসিদ্ধি কেরালার উদ্ভিদকুল নিয়ে রচিত হর্টাস মালাবারিকাস বইটির কারণেই বেশি। যদিও, ডেভিড হল নামকরণ করা হয়েছিল এই ভবনটির পরবর্তীকালের স্বত্বাধিকারী জনৈক ডেভিড কোডারের নামানুসারে।

এরপর হেঁটে পার করুন এখানকার বিখ্যাত প্যারেড গ্রাউন্ড, যে প্যারেড ময়দানে পর্তুগীজ, ওলন্দাজ ও ব্রিটিশ প্রত্যকেরই সৈনবাহিনী কুচকাওয়াজ করত, এবং পৌঁছে যান সেন্ট ফ্রান্সিস গির্জায়, যা ভারতবর্ষে স্থিত প্রাচীনতম ইউরোপীয় গির্জা। 1503 সালে পর্তুগীজ শাসকদের দ্বারা নির্মিত এই গির্জা বহু ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর সাক্ষী থেকেছে। বর্তমানে এই গির্জাটি দক্ষিণ ভারতের গির্জার অধিনস্থ। প্রসঙ্গত বলে রাখি, এই গির্জাতেই ভাস্কো দা গামা সমাহিত হয়েছিল এবং সেই সমাধিপ্রস্তর আজও সেখানে দেখা যায়।

পায়ে হেঁটে বেড়ানোর জন্য চার্চ রোড একটি অতি চমৎকার রাস্তা যেখানে হাঁটার সময় আরব সাগরের শীতল বায়ু আপনার দেহ চুম্বন করে চলে যায়। কিছুটা হেঁটে সমুদ্রের কাছাকাছি যান, আপনি কোচিন ক্লাবের দেখা পাবেন, যেখান প্রচুর বহুমূল্য বইপত্র ও ট্রফি সংগ্রহে রাখা আছে। সুন্দর ভূদৃশ্যে স্থাপিত এই ক্লাবে আজও একটি ব্রিটিশ পরিবেশ বজায় রয়েছে।

চার্চ রোড ধরে আপনি যখন ফিরবেন, রাস্তার বাঁ-দিকে আরেকটি রাজকীয় ভবনের সামনে আপনি এসে পড়বেন, ব্যাস্চন বাংলো। ইন্দো-ইউরোপীয় শৈলীতে নির্মিত এই বাংলোটি তৈরি হয়েছিল 1667 সালে এবং প্রাচীন দুর্গটির নির্মাণস্থল স্ট্রমবার্গ ব্যাস্চন-এর নাম অনুসারে এই গির্জার নামকরণ করা হয়েছিল। বর্তমানে এটি উপ-সমাহর্তার সরকারি বাসভবন।  

কাছেই রয়েছে ভাস্কো দা গামা চৌরঙ্গি। এই সরু এক চিলতে বেড়ানোর জায়গায় কিছুক্ষণ বসে আরাম করতে বেশ ভালই লাগবে। জিভে জল আনা সামুদ্রিক পদ এবং নরম নারকেল বিক্রেতা দোকানগুলি আপনাকে তীব্রভাবে প্রলুব্ধ করবে। এগুলির মধ্যে থেকে কয়েকটির আস্বাদ নিন এবং চোখ দুটিকে চিন দেশীয় মাছ ধরার জালগুলি জলে ফেলা ও তোলার অসাধারণ দৃশ্য দেখতে দিন। এই সুদৃশ জালগুলিকে এখানে 1350 থেকে 1450 সালের মধ্যবর্তী সময়ে কুবলাই খানের রাজসভা থেকে আসা ব্যবসায়িরা স্থাপন করেছিলেন।

একটু তরতাজা হয়ে নিয়ে আপনি আবার বেড়িয়ে পড়তে পারেন পীয়ার্স লেসলি বাংলোর উদ্দেশ্যে, এক রম্য ভবন, যা একদা অতীতের কফি ব্যবসায়ী পীয়ার্স লেসনি অ্যান্ড কোং-এর কার্যলয় ছিল। এই ভবনের নির্মাণশৈলীতে পর্তুগীজ, ওলন্দাজ ও স্থানীয় রীতির ছাপ রয়েছে। এই বাংলোর সমুদ্রের দিকে মুখ করা বারান্দাটি এর আকর্ষণ আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। ডান দিকে বাঁক নিয়ে আপনি ওল্ড হার্বার হাউস-এ চলে আসতে পারেন, যেটি 1808 সালে নির্মিত হয়েছিল এবং খ্যাতনামা চা নিলামকারী সংস্থা ক্যারিয়েট মোরান অ্যান্ড কোং-এর মালিকানাধীন ছিল। এর কাছেই রয়েছে কোডার হাউস। এক ভব্য অট্টালিকা যা 1808 সালে কোচিন ইলেকট্রিক কোম্পানির স্যামুয়েল এস. কোডার সাহেবের দ্বারা নির্মিত। এই ভবনটিতে ঔপনিবেশিক স্থাপত্যশৈলী থেকে ইন্দো-ইউরোপীয় স্থাপত্যশৈলীতে পরিক্রমণের ছাপ রয়েছে।

আবারও ডান দিকে বাঁক নিন, আপনি প্রিন্সেস ট্রীটে এসে পড়বেন। এখানকার দোকানগুলি থেকে কিছু তাজা ফুল কিনতে ভুলবেন না। এই অঞ্চলের অন্যতম প্রাচীনতম এই রাস্তাটির দু’ধারের ভবনগুলিই ইউরোপীয় নির্মাণশৈলীতে তৈরি। এখানে স্থিত লোফার্স কর্ণার প্রাণোচ্ছল ও আমোদপ্রিয় কোচিবাসীদের আড্ডা দেবার এক চিরাচরিত স্থান।

লোফার্স কর্ণার থেকে উত্তর দিকে হেঁটে গেলে আপনি সান্তা ক্রুজ গির্জাপ্রাসাদে এসে উপস্থিত হবেন, যা পর্তুগীজদের দ্বারা নির্মিত এক ঐতিহাসিক গির্জা, যেটিকে 1558 সালে মহামান্য পোপ পল IV খ্রীষ্টীয় গির্জার মর্যাদায় উন্নীত করেছিলেন। 1984 সালে মহামান্য পোপ জন পল II এটিকে একটি গির্জাপ্রাসাদ হিসেবে ঘোষণা করেন। এরপর বার্গার স্ট্রীটে স্থিত, বর্তমানে উচ্চ বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত, 1808 সালে নির্মিত ঐতিহ্যবাহী বাংলো ডেল্টা স্টাডি দ্রুত দেখে নিয়ে, আপনি নিচের দিকে আবারও প্রিন্স স্ট্রীটে নেমে আসুন এবং সেখান থেকে রোজ স্ট্রীটে চলে যান। সেখানে গিয়ে আপনি যা দেখবেন, তা হলে ভাস্কো হাউস, যা ভাস্কো দা গামার বাড়ি বলে লোকের বিশ্বাস। এই পরম্পরাগত ও আদর্শগতভাবে ইউরোপীয় আদলে তৈরি এই বাড়িটি কোচির সবচেয়ে প্রাচীন পর্তগীজ বাসভবনগুলির মধ্যে অন্যতম।  

বাঁ-দিকে বাঁক নিয়ে আপনি রিডসডেল রোড ধরে VOC দ্বারের উদ্দেশ্যে হেঁটে যাবেন, যা কুচকাওয়াজ ময়দানের দিকে মুখ করা একটি বিশালাকার দরজা। 1740 সালে নির্মিত এই বিশাল দরজাটির নামকরণ ডাচ্ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মনোগ্রাম (VOC) অনুসারে করা হয়েছিলন। এর খুব কাছেই রয়েছে ইউনাইটেড ক্লাব, যা একদা কোচিতে অবস্থিত ব্রিটিশদের চারটি অভিজাত ক্লাবের একটি। বর্তমানে এটি নিকটবর্তী সেন্ট ফ্রান্সিস প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

সোজা হেঁটে গেলে আপনি এই রাস্তার শেষে এসে পৌঁছবেন এবং সেখানেই রয়েছে বিশপের বাসভবন, যা 1506 সালে নির্মিত হয়েছিল। একদা এটি পর্তুগীজ গভর্ণরের বাসভবন ছিল এবং এটি কুচকাওয়াজ ময়দানের নিকটস্থ একটি টিলার উপর নির্মিত হয়েছিল। ভবনের সম্মুখভাগে বিশালাকার গথিক খিলান রয়েছে এবং এই ভবনটি পরবর্তীতে ডন জস গোমেজ ফেরেইরা দখল করে নেন, যিনি কোচিন গির্জা অধিক্ষেত্রের 27তম বিশপ ছিলেন, যে অধিক্ষেত্র ভারতবর্ষ অতিক্রম করে বার্মা, মালয় ও সিংহল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

হ্যাঁ, এইবার আপনার ফিরে যাবার সময় এসেছে। আপনার মনের আনাচে-কানাচে এখনও পর্যন্ত উঁকি দিতে থাকা অতীতচারণ, চোখে লেগে থাকা মনোমুগ্ধকর সমস্ত দৃশ্য এবং চেখে দেখা দেশীয় খাবারের আস্বাদ জিভে নিয়ে, ফেরার জন্য উদ্যোগ নিয়ে আপনি যদি আরও একবার একই রাস্তায় হেঁটে আসতে চান, তাহলে হয় দোষের কিছু হবে না!


 
 
 
Photos
Photos
information
Souvenirs
 
     
Department of Tourism, Government of Kerala,
Park View, Thiruvananthapuram, Kerala, India - 695 033
Phone: +91-471-2321132 Fax: +91-471-2322279.

Tourist Information toll free No:1-800-425-4747
Tourist Alert Service No:9846300100
Email: info@keralatourism.org, deptour@keralatourism.org

All rights reserved © Kerala Tourism 1998. Copyright Terms of Use
Designed by Stark Communications, Hari & Das Design.
Developed & Maintained by Invis Multimedia